Post has attachment

(১)
আপনি যখন অসহিষ্ণুতাকে প্রশ্রয় দিতে থাকবেন তাতে লাভ হয় শুধু ফ্যাসিস্ট শক্তিগুলির। আপনি ভাবতে পারেন যে আপনি দেশের 'বাস্তবতা' বিবেচনায় সাময়িকভাবে আপোষ করছেন বা স্থিতিশীলতার স্বার্থে ভারসাম্য করছেন। কিন্তু রাষ্ট্রীয় জীবনের সর্বত্র সব ধাপে সব ক্ষেত্রে আপনি যদি অসহিষ্ণুতা দুর করার পদক্ষেপ শুরু থেকেই না নেন তাইলে ধীরে ধীরে ফ্যাসিস্ট শক্তিগুলি শক্তি বাড়াতে থাকবে এবং একদিন আপনাকে মেরে তাড়াবে।

অসহিষ্ণুতা কি? যখন একদল লোক ভিন্নমতকে গলা টিপে ধরতে চাইবে, সেটাই অসহিষ্ণুতা। আমাদের এখানে যে ভিন্নমতের জন্যে মুক্তমনা লেখকদেরকে হত্যা করা হচ্ছে, এটা অসহিষ্ণুতা। এই যে প্রাণে মেরে ফেলার ভয় দেখিয়ে আমাদের উজ্জ্বল সব ছেলেমেয়েদেরকে দেশ ত্যাগে বাধ্য করছে এটা অসহিষ্ণুতা। এইসব যদি বন্ধ করতে না পারেন, যদি মানুষকে নির্ভয়ে মত প্রকাশ করতে না দিতে পারেন, তাইলে বাংলাদেশের জন্যে সামনে অপেক্ষা করছে ভয়ংকর দুর্যোগ।

আর আপনারা যদি নিজেরা ভিন্নমতের কণ্ঠরোধ করতে চান, তাইলে আপনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভুলে গেলেন। আপনি আর আমাদের স্বাধীনতার পক্ষের লোক থাকলেন না। কারণ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলতে যে কথাটা আমরা সস্তাভাবে বলে ফেলি, সেটা আসলে অত ছোট জিনিস না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কেবল রাজাকারকে শাস্তি দেওয়া না। রাজাকারের ফাঁসিটা ফরজ কাজ, করতেই হবে। কিন্তু ফাঁসি দিয়ে ফেললেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন হয়ে যায়না।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হচ্ছে একটা স্বাধীন গণতান্ত্রিক সেক্যুলার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে মানুষে মানুষে বৈষম্য থাকবে না। মনে রাখবেন গণতন্ত্র ও সেক্যুলারিজম হচ্ছে আমাদের স্বাধীনতার মুল আদর্শ, এই কারণেই আমরা পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ করেছি। (সেক্যুলারিজমকেই তখন আমাদের নেতারা বাংলা করেছিলেন ধর্মনিরপেক্ষতা। এর স্বরূপ নিয়ে নানারকম আলোচনা আছে।)

(২)
সেক্যুলারিজম কি আমাদের স্বাধীনতার চেতনার বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অংশ? এই প্রশ্নটা ভালোভাবে ভেবে দেখেন। কারণ এই প্রশ্নের উত্তরের উপর নির্ভর করছে আমার রাষ্ট্রের চরিত্র, রাষ্ট্রের আচরণ এবং আমাদের নিজেদের অধিকারের মাত্রা ও ধরন।

আমরা পাকিস্তান থেকে আলাদা রাষ্ট্র কেন গঠন করেছি? কত শখ করে মুসলমানদের জন্যে একটা দেশ বানিয়েছিলাম পাকিস্তান। সেই পেয়ারে পাকিস্তান ভাঙ্গা কেন জরুরী হয়ে পরেছিল সেটা দেখেন। সে কি কেবল কে প্রধানমন্ত্রী হবে আর কে হবেনা সেই বিবাদের জন্যে? জি না জনাব। আমরা পাকিস্তান রাষ্ট্র থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছি কারণ আমরা ধর্মের ভিত্তিতে জাতী গঠনের তত্বের ভ্রান্তি ধরতে পেরেছিলাম পাকিস্তান সৃষ্টির অল্প কয়েকদিন পরেই।

আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে আমাদের ধর্ম এক হতে পারে, কিন্তু একজন পাঞ্জাবী কিংবা সিন্ধি কিংবা বালুচ কেবল মুসলমান বলেই আমার জাতিভাই হয়ে যায়না। মুসলমান মুসলমান ভাই ভাই হতে পারে কিনা সেটা এক প্রশ্ন, কিন্তু এক জাতী হতে পারেনা যদি না সাথে সাংস্কৃতিক ঐক্য থাকে। পক্ষান্তরে আমরা এটাও দেখেছি যে ভাষা ও সংস্কৃতির যদি ঐক্য থাকে তাইলে ধর্ম ভিন্ন হলেও এক জাতী হতে পারে।

একারণেই আমরা শ্লোগান পদ্মা মেঘনা যমুনা তোমার আমার ঠিকানা, তুমি কে আমি কে বাঙ্গালী বাঙ্গালী, বীর বাঙ্গালী অস্ত্র ধর ইত্যাদি। লক্ষ্য করে দেখেন, এইসব শ্লোগান কিন্তু আমরা যুদ্ধ শুরুর বেশ আগে থেকেই দেওয়া শুরু করেছিলাম। আরও লক্ষ্য করবেন সেই সময় আমাদের প্রেরণার উৎস যেসব গান ছিল সেগুলির মধ্যে অনেকগুলিই ছিল বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করে লেখা রবীন্দ্রনাথ এবং অন্যদের গানগুলি।

আর চেয়েছিলাম গণতন্ত্র। কেননা আমাদের লড়াইটা গণতন্ত্র আর জাতিগতভাবে আমাদের নিজেদের আত্ম পরিচয় প্রতিষ্ঠা এই দুইটা মুল দাবীই ছিল আমাদের দীর্ঘ সংগ্রামের কেন্দ্রীয় দাবী। আর গণতন্ত্র থাকলে তো সেখানে ধর্মনিরপেক্ষতা একটা অনিবার্য অনুষঙ্গ হিসেবে এমনিতেই চলে আসে।

(৩)
কিন্তু আমাদের মধ্যেও লোকজন ছিল যারা সেই অর্থে ধর্মনিরপেক্ষতা চাইতেন না। এঁদের অনেকে যুদ্ধের সময় আমাদের সাথেই ছিলেন বটে, যুদ্ধে আমাদের পক্ষেরই লোক ছিলেন। কিন্তু ওদের ধারনা ছিল বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হলেও আদর্শগতভাবে এটা পাকিস্তান রাষ্ট্রের মতোই আরেকটা রাষ্ট্র হবে। বাঙ্গালী মুসলমানদের রাষ্ট্র। অন্যভাবে বললে, ওরা চেয়েছিলেন একটা পাকিস্তান ভেঙে দুইটা পাকিস্তান হবে। একটা বাঙ্গালী মুসিলমানের পাকিস্তান আরেকটা অবাঙ্গালী মুসলমানদের পাকিস্তান।

আবুল মনসুর আহমেদ ছিলেন এই লাইনের লোক। তিনি একরকম স্পষ্ট করেই লিখেছিলেন যে দ্বিজাতিতত্বই বংলাদেশ রাষ্ট্রের ভিত্তি। জিয়াউর রহমান চেষ্টা করেছিল বাংলাদেশকে সেই লাইনেই নিয়ে যেতে। এই আদর্শের কারণেই জিয়াউর রহমান আমাদের জাতীয়তাবাদ বাঙ্গালী থেকে পাল্টে বাংলাদেশী করেছিল। এটা সেই সময় জিয়ার পক্ষের বুদ্ধিজীবীরা বক্তৃতা দিয়ে লেখালেখি করে বলতেনও।

এখনো আমাদের এখানে একদল লোক আছে। এরা আপাত দৃষ্টিতে বেশ প্রোগ্রেসিভ ধরনের কথাবার্তা বলেন। অনেকে তো সমাজতন্ত্র মার্ক্সবাদ ইত্যাদিও বলেন। কিন্তু এরা আমাদের জাতীয় পরিচয়ের ক্ষেত্রে মুসলিম পরিচয়টাকেই মুখ্য মনে করেন। এদের মধ্যে কেউ কেউ নাকি সম্প্রতি একথাও বলার চেষ্টা করেছেন যে ধর্মনিরপেক্ষতা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অংশ না। এরা নতুন কিছু না। দ্বিজাতিতত্বের পক্ষের লোক, অর্থাৎ মুসলিম জাতীয়তাবাদের পক্ষের লোক।

ওরা এইসব যা বটে চায় বলুক। কিন্তু দ্বিজাতিতত্ব ভুল প্রমাণিত হয়েছে। ধর্ম আমাদেরকে অবাঙ্গালীদের সাথে একসাথে জাতী গঠনের ওজনয়ে বাঁধতে পারেনি। আমরা দ্বিজাতিতত্বকে লাথি মেরেই বাংলাদেশ বানিয়েছি।

(৪)
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে দ্বিজাতিতত্বের কথা আসছে কি করে? আসছে কারণ আপনি যদি ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠিত করতে না পারেন তাইলে মানুষের বাক ও চিন্তার স্বাধীনতা বিঘ্নিত হবে বেশী এবং রাষ্ট্রে সংখ্যাগুরুর স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠিত হবে। সেজন্যে বাক স্বাধীনতা সুরক্ষা করতে হলে আপনাকে ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠিত করতেই হবে।

দেখেন, এমনিতেই জাতীয়তাবাদী চেতনা জিনিসটার মধ্যেও সংখ্যাগুরুর স্বৈরাচারের বীজ প্রোথিত থাকে। কেননা জাতীয়তাবাদ নিজের একটি জাতী গোষ্ঠীর লোককে ঐক্যে বাঁধতে গিয়ে অন্যদেরকে শত্রু করে দেয়। একারণেই জাতীয়তাবাদী চেতনা যতটা উগ্র হবে, ততই সেটা ফ্যাসিস্ট রূপ নেবে। মানব ইতিহাসে এরকম তো হয়েছে। আপনি যদি আবার জাতীয়তাকে ধর্মের পরিচয়ে প্রতিষ্ঠা করতে চান, তাইলে সেটা কি হবে অনুমান করতে পারেন।

আপনি এর মধ্যেই ভারতে মোদী সরকার আসার পর কি হচ্ছে দেখেছেন। ভারতীয় জাতীয়তাবাদের সাথে হিন্দুত্ব মিশানোর চেষ্টার ফলাফল এইগুলি। আরও দেখবেন, অপেক্ষা করেন।

আমাদের এখানে সম্প্রতি ধর্মীয় ফ্যাসিস্ট গোষ্ঠী বাক ও চিন্তার স্বাধীনতার বিরুদ্ধে আদাজল খেয়ে নেমেছে, ওদের পছন্দ না এমন কিছুই ওরা বলতে দেবেনা। রাষ্ট্র কি এদেরকে সেভাবে মোকাবেলা করতে চাইছে? মোকাবেলা তো দুরের কথা, রাষ্ট্র তো ওদেরকে একটা সমস্যা হিসেবে স্বীকারই করতে চাইছে না। উল্টা লেখকদেরকে নিয়ন্ত্রণ করে, আর মৌলবাদীদের হয়ে লেখক প্রকাশকদেরকে হেনস্তা করে। উদাহরণ দেওয়ার দরকার আছে?

এইখানে একটা মৌলিক প্রশ্ন করতেই হয়। আওয়ামী লীগ সরকার কি আসলেই ধর্মনিরপেক্ষতা চায়? ধর্ম নিরপেক্ষতার নানারকম অর্থ করা হয় মানি। কিন্তু আওয়ামী লীগ কি কোন অর্থেই ধর্ম নিরপেক্ষতা চায়? নাকি ওরাও বঙ্গবন্ধুর রাস্তা ছেড়ে আবুল মন্সুর আহমেদের লাইনে দ্বিজাতিতত্বে ফিরে গেছে?

আমি জানি আওয়ামী অল্গের লক্ষ লক্ষ ত্যাগই নেতা কর্মীর বেশিরভাগই এখনো বুকে বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শ ধরে রেখেছে। ওরা বেশিরভাগই আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের এইসব আপোষকামিতাকে কৌশলগত চাল মনে করে। কিন্তু আওয়ামী লীগ কি এখন আর আসলেই ধর্মনিরপেক্ষতা চায়?

আমার সন্দেহ হচ্ছে, আমার সন্দেহ যদি ভুল প্রমাণিত হয়, তিয়ালে আমার চেয়ে খুশী কেউ হবেনা।

(৫)
বাক স্বাধীনতার সাথে এই দ্বিজাতিতত্বের সংঘর্ষ অনিবার্য। কেননা আপনি যখনই জাতীয় পরিচয়ে ধর্মকে নিয়ামক বৈশিষ্ট্য বানাবেন তখন মানুষের কণ্ঠ আপনাকে রোধ করতেই হবে। ধর্ম তো ভিন্নমত সহ্য করে না, কোন ধর্মেই ভিন্নমতের সুযোগ নাই। আমরা তো আমাদের দীর্ঘ মুক্তির সংগ্রাম পরিচালিত করেছিই ধর্মীয় ভিত্তিতে জাতী গঠনের আইডিয়ার বিপরীতে। ওদেরকে হারিয়েই আমরা স্বাধীন হয়েছি।

একারণেই দেখবেন ধর্মীয় সংগঠনগুলি ছাড়াও যারা আমাদের জাতীয় পরিচয়ে ধর্মীয় পরিচয়টাকে নিয়ামক বৈশিষ্ট্য মনে করে ওরাও মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার যে সেক্যুলার বক্তব্য বা গান সেগুলিকে অস্বীকার করতে চায়। একারণেই জিয়াউর রহমান জয় বাংলা শ্লোগান পাল্টে বাংলাদেশ জিন্দাবাদ চালু করেছিল। একারণেই এখনো দেখবেন বেগম জিয়া মুক্তিযুদ্ধের অর্জনকে যতটা সম্ভব খাত করতে পারলে খুশী হয়। বিএনপিকে দেখবেন স্বাধীনতার ইতিহাসকে ১৯৭১র যুদ্ধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে চায়।

কিন্তু আওয়ামী লীগও যদি এই কাজ করে তাইলে তো অবাক হতেই হয়। হতাশও হতে হয়। সেই সাথে আশঙ্কাও জাগে। আওয়ামী লীগও কি তবে দ্বিজাতিতত্বে ফেরত যেতে চাইছে?

লিখেছেন ইমতিয়াজ মাহামুদ
Wait while more posts are being loaded