Post has attachment
লালনের জীবন-কথা জানা সহজ না হইলেও অসম্ভব নয়। কারণ এখনও বহু বৃদ্ধ জীবিত আছেন যাঁহারা লালনের সন্মন্ধে অনেক খবরই রাখেন।

এদেশের অন্যান্য সাধু পুরুষদিগের জীবন অপেক্ষা লালনের জীবন-কথা জানা আরও সহজ এই জন্য যে, তাহাঁদের জীবনে যেমন নানারূপ অসম্বভ অলৌকিক কাহিনী দ্বারা পরিপূর্ণ, লালনের জীবন-কথা তেমন নহে। তাঁর শিষ্যেরা যদিও তাহাঁকে খুব ভক্তি করে কিন্তু তাহাঁকে খোদা বলিয়া জানে না। তাই লালনের জন্মস্থান বাপ-মা বাড়ি-ঘর তাহাঁদের ভক্তির উচ্ছাসে দ্বিতীয় নবদ্বীপ হইয়া উঠে নাই। এমনকি #লালন কোন জাতির ছেলে - কোথায় তাঁর বাড়ি-ঘর ইহাও তাঁহারা ভালো করিয়া বলিতে পারে না। তাঁহারা পাইয়াছে লালনের অসংখ্য গান সুখে দুঃখে একতারার সুরে সুরে সুর মিশাইয়া তাই লইয়া তাঁহারা সারাটি জীবন কাটাইয়া দেয়।

লালনের মৃতর পর কুমারখালির হিতকরি প্রত্রিকায় লালনের সন্মন্ধে একটি প্রবন্ধ বাহির হইয়াছিল। তাহাঁতে লালনের পূর্ব বৃত্তান্ত এইরুপঃ-

“সাধারণে প্রকাশ লালন ফকীর জাতিতে কায়স্থ। কুষ্টিয়ার অধীন চাপড়া ভৌমিক বংশীয়েরা ইহাদের জাতি। ইহার কোন আত্নীয় জীবিত নাই। ইনি নাকি তীর্থ গমন কালে পথে বসন্ত রোগে আক্রান্ত হইয়া সঙ্গীগণ কর্তৃক পরিত্যক্ত হয়েন। পথে মুমূষ অবস্থায় একটি মুসলমানের দয়া ও আশ্রয়ে জীবন লাভ করিয়া ফকীর হন। ইহার মুখে বসন্তের দাগ বিদ্যমান ছিল।”

সম্প্রতি গত শ্রাবণ মাসে ‘প্রবাসী’তে বাবু বসন্তকুমার পাল মহোদয় তাঁর সন্মন্ধে যে সুন্দর প্রবন্ধ লিখিয়াছেন, তাহাঁতে এই বৃত্তান্তের অনুসরণ করা হইয়াছে। এমনকি তিনি লালনের পিতা-মাতা ও আত্নীয়-স্বজনের পরিচয় দিতেও কুন্ঠিত হন নাই। আমরা কিন্তু লালনের গ্রামের কাহারও কাছে এরূপ বৃত্তান্ত শুনি নাই। তাঁহার বাড়ীর পূর্ব-পার্শ্বের এক বৃদ্ধ তাঁতির কাছে আমরা লালনের জন্ম-বিবরণ এইরূপ শুনিয়াছিঃ-

তিনি ব্রাহ্মণ বংশে জন্মগ্রহণ করেন। ছেলেবেলায় তাঁর মা তাঁকে সঙ্গে লইয়া তীর্থ করিতে নবদ্বীপে যান। সেখানে লালন বসন্ত রোগে আক্রান্ত হইলে অভাগিনী জননী তাঁকে নদীর ধারে ফেলিয়া আসেন। নদীর ঠাণ্ডা হাওায়ায় যখন শিশুর চৈতন্য ফিরিয়া আসিল তখন প্রভাত হইয়াছে। একটি মুসলমান মেয়ে জল আনিতে নদীতে যাইয়া অতটুকু ছেলেকে তখন পড়িয়া থাকতে দেখিয়া তাহাঁকে তুলিয়া বাড়ীতে লইয়া আসেন। তাঁহারই সেবাই যত্নে এই শিশু দিনের পর দিন বাড়িয়া উঠেন। উক্ত স্ত্রীলোকটির গুরু ছিলেন তৎকালিন যশোরের উলুবেড়িয়া গ্রামের সিরাজ সাঁই। শিশুটি একটু বড় হইলে সিরাজ সাঁই তাঁহাকে চাহিয়া লন এবং তাঁহারই শিক্ষার গুণে লালনের লেখাপড়া ও ধর্মজীবনের সুত্রপাত হয়; এবং কালক্রমে লালন মুসলমান ধর্মে দীক্ষিত হন।

আরো জানতে নিচের লিঙ্কে ক্লিক করুনঃ-

Post has attachment
পাঞ্জু শাহের আত্নদর্শন পর্যালোচনাকালে তাঁর আধ্যাত্মিক চিন্তা সম্পর্কে আভাস দেওয়া হয়েছে। দর্শনে আধ্যাত্ববাদের প্রভাব অনস্বীকার্য। এজন্য দর্শন বিচার সত্ত্বেও পাঞ্জু শাহের আধ্যাত্ব- চিন্তার স্বরুপ- স্বাতন্ত্র্য নিয়ে পৃথক আলোচনা আবশ্যক। এখানে সে বিষয়ে রইলো সামান্য আলোকপাতের প্রয়াস।

ধর্মীয় অনুভূতি ও বিশ্বাস আধ্যাত্ববাদের মূল কথার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্বন্ধযুক্ত। চিরাচরিত ধর্মবিশ্বাসের সারকথা - “বিশ্বের অসংখ্য বৈচিত্রের পশ্চাতে একটি ব্যপক চেতন- সত্তার স্বীকৃতি”। এই সর্বব্যাপী চেতনা - সত্তারই নাম ধর্মশাস্ত্রে আল্লাহ, খোদা, ভগবান, গড ইত্যাদি। দর্শনশাস্ত্রে এই চেতন সত্ত্বারই নাম পরমসত্ত্বা, এ্যাবসিলিউট। ইতিহাসে দেখা যায়, দার্শনিকগণ আধ্যাত্ববাদের ইঙ্গিত খুঁজে পেয়েছেন একত্ব অনুভূতির ভিতর। এই একত্ব অনূভূতি ধর্মশাস্ত্রে নানাভাবে বর্ণিত। তাই আধ্যাত্ববাদের প্রাচীন সমর্থকমন্ডলী শাস্ত্রবাক্য ব্যাখ্যার মাধ্যমে আধ্যাত্বতত্ত্ব প্রমাণ করার প্রয়াস পেয়েছেন। প্রাচীনকালে আধ্যাত্ববাদীরা অগাধ ধর্মীয় অনুভূতি নিয়েই দার্শনিক বিশ্লেষণ শুরু করেছেন। ফলে তাঁদের দর্শনে আগে ঈশ্বরের স্থান, পরে জগতের স্থান। ঈশ্বরের অনুভূতি থেকেই প্রাতহিক জগতের অনুভূতিতে অবতরণ। এটাই তাঁদের দার্শনিক চিন্তার বড় বৈশিষ্ট্য।

মুসলিম দার্শনিকগণ তাঁদের ধর্মচিন্তার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ধর্ম ও দর্শনের সমঝোতা আবিস্কারের চেষ্টা করেছেন, তার মূলেও এই একই সত্যের প্রতীতি। তাঁদের নিজস্ব দার্শনিক মতবাদ গঠনে প্লেটোনিক, এরিস্টিটোলিয়ান এবং নিওপ্লেটোনিক চিন্তাধারা ব্যবহৃত হওয়া সত্ত্বেও দিবাদর্শন অর্থ্যাৎ জ্ঞানাতীত সত্ত্বার সাথে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সত্ত্বাসমূহের সম্পদের ব্যাখ্যা প্রাধান্য পেয়েছে। ফলে মুতাজিলাবাদী এবং আশারীপন্থীরা তাঁদের অর্ন্তদন্দ্ব সত্ত্বেও উল্লেখিত দার্শনিকগণের প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে রোজকেয়ামতে পূণ্যাত্বাদের আল্লাহর সাক্ষাৎ দর্শনের কথা স্বীকার করেছেন এবং নিজেদের দার্শনিক মতানুসারে এর সঙ্গতি ও সম্ভাবনা ব্যাখ্যা করেছেন। এতে এক ‘সর্বব্যাপী একক চেতনা’ যা জড় পদার্থ নয়, বিভাজ্য সত্ত্বা নয়, সঠিকভাবে বর্ণণা-যোগ্য নয়, তারই স্বীকৃতি ব্যক্ত হয়েছে।

আধ্যাত্ববাদী দর্শনের প্রবত্তাগণ দুটি দলে বিভক্ত। একদল দার্শনিক সর্বব্যাপী একক চেতনার উপর অত্যাধিক গুরুত্ব আরোপ করে দৈনন্দিন জীবণের তাত্ত্বিক মূল্য প্রায় সম্পূর্ণরুপে উপেক্ষা করেছেন। অন্য দল শ্বাশত, অবিনশ্বর, সর্বত্রুটিমুক্ত এই ‘সর্বব্যাপী একক চেতনা’ এবং ‘চলমান’, নশ্বর, ক্ষণভঙ্গুর, ত্রুটিযুক্ত অভিজ্ঞতার জগৎ’ - এদুটোকে মিলিয়ে তত্ত্ব নির্ণয়ের চেষ্টা করেছেন। তবে উভয় দলই এই সর্বব্যাপী চেতনাকে সবচেয়ে বড় সত্তা বলে মেনে নিয়েছেন। তাঁদের মতে এই সত্ত্বার এক নাম ‘ভূমা’ অন্য নাম ‘ব্রহ্ম’। দর্শন সাহিত্যে ‘ব্রহ্ম’ শব্দটি বেশী প্রচলিত। এক্ষণে এই একক সর্বব্যাপী শাশ্বত পরিপূর্ণ স্বভাবসত্ত্বাকে যাঁরা বিশ্বের চরম তত্ত্ব বলে নিরুপন করেন, সেই আধ্যাত্ববাদী দার্শনিকদের মতের প্রচলিত নাম ব্রহ্মবাদ বা একত্ববাদ।একত্ববাদ আবার দুই প্রকার। যথা - নির্বিশেষ একত্ববাদ এবং সবিশেষ একত্ববাদ। নির্বিশেষ একত্ববাদ অনুসারে ব্রহ্মই পরম ও চরম সত্তা, বিশ্বজগতের সত্যিকার সত্তা নেই। আর সর্বশেষ একাত্ববাদ অনুসারেও ব্রহ্মই পরম সত্তা এবং ব্রহ্মের অবিচ্ছেদ্য অভিব্যক্তি হিসেবে বিশ্বজগতের সত্তাও আছে।

পাঞ্জু শাহের আধ্যাত্ব - চিন্তা এই নির্বিশেষ একত্ববাদ - ভিত্তিক। তাঁর মতে জগতের সত্তা মানুষের অনুভূতি সাপেক্ষ। মানুষ যত দিন ব্রহ্মকে জানে না, তত দিনই তার কাছে জগতের অনুভূতি ব্যাপক। যে মুহূর্তে সে ব্রাহ্মকে জানে, জগতের সত্তা সেই মুহূর্তেই ব্রহ্মসত্তায় হারিয়ে যায়। এমনকি মানুষ নিজেও ব্রাহ্মের সঙ্গে এক হয়ে যায়। পাঞ্জুর জীবণে এই ব্রহ্ম- অনুভূতি অতি ধীরে অথচ গভীরভাবে জাগ্রত হয়েছে। এ জন্য সংসার, সমাজ এবং দেশকালে অবস্থান করেও তিনি সবকিছুকে ত্যাগের দৃষ্টিতে দেখতে পেয়েছেন। স্ত্রী - পুত্র, আতœীয়-স্বজন, বিষয়- আশয় নিয়ে ঘড় গৃহস্থলী চালিয়েও ‘সর্বব্যাপী একক চেতনা’ অনুভব করা তাঁর পক্ষেই সম্ভব হয়েছে; এ বিশ্বজগত লয়প্রপ্তির পর সেই একক ব্রাহ্ম, ধর্মীয় ভাষায় যিনি আল্লাহ, তিনি জীন - ইনসানের হিসেব নিবেন-
‘আল্লাহতালা কাজী হবে,
নেকী বদীর হিসাব নেবে।

আরো জানতে নিচের লিঙ্কে ক্লিক করুনঃ-

Post has attachment
১১ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালের এই দিনে কুষ্টিয়া জেলার মুক্তি সেনারা রক্তক্ষয়ই সংগ্রাম করে ছোট-বড় ২২ যুদ্ধ শেষে পাকবাহিনীর হাত থেকে কুষ্টিয়াকে মুক্ত করেছিলেন। অত্যাধুনিক অস্ত্রেশস্ত্রে সজ্জিত হানাদার পাকসেনার বিরুদ্ধে সাহসী বাঙ্গালী তরুণ মুক্তিযোদ্ধারা অমিত তেজে অসীম সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করে কুষ্টিয়ার পবিত্র মাটি পাক হানাদার সেনাদের হটিয়ে মুক্ত করতে সক্ষম হয়েছিল। হাজার হাজার মুক্তিকামী মানুষের গগণবিদারী ‘জয় বাংলা’ শ্লোগানে সেদিন কুষ্টিয়ার আকাশ-বাতাস মুখোরিত হয়ে উঠেছিল।

পথে প্রান্তরে গড়ে তোলা হয়েছিল বেরিকেড। লাঠি-সড়কি, ঢাল-তলোয়ার নিয়ে হরিপুর-বারখাদা, জুগিয়া, আলামপুর, দহকোলা, জিয়ারুখী, কয়া, সুলতানপুর, পোড়াদহ, বাড়াদিসহ বিভিন্ন গ্রাম থেকে মানুষ ছুটে এসেছিল কুষ্টিয়া শহরে।

ঐতিহাসিক ৭ মার্চে রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণে সেদিন সে সব মানুষের চোখে মুখে ছিল মুক্তির নেশা, প্রাণে ছিল বঙ্গবন্ধুর শেষ উচ্চারণ-‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। মুক্তির সনদ উচ্চারণকে বুকে ধারণ করে সারা দেশের ন্যায় কুষ্টিয়ার মুক্তিকামী মানুষেরাও প্রস্ত্ততি নেয় মুক্তির পথ অন্নেষণে। এই ভাষনের পর পরই বাঙালীদের প্রতিহত করতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ যুদ্ধ পরিকল্পনা হিসেবে পাক সেনাবাহিনীর ২৭ বেলুচ রেজিমেন্টের এক কোম্পানী সৈন্য ২৫ মার্চ রাতে যশোর সেনানিবাস থেকে কুষ্টিয়া এসে অবস্থান গ্রহণ করে। এবং এক নাগাড়ে ৩০ ঘন্টার জন্য সান্ধ্য আইন জারি করে সশস্ত্র অবস্থায় টহল দিতে থাকে। বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর মেজর আবু ওসমান পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিপক্ষে অবস্থান নেয়। ঐ সময় ১ম বেঙ্গল রেজিমেন্টে লেঃ কঃ রেজাউল করিমের নেতৃত্বে পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিয়মিত শীতকালীন মহড়ায় যশোর ঝিকর গাছায় অবস্থান করছিল। এ সময় কুষ্টিয়ার রাজনৈতিক নেতৃত্ববৃন্দ এবং আবু ওসমানের সাথে আলাপ আলোচনা স্বাপেক্ষে ক্যাপঃ আযম চৌধুরীকে যশোরে ঝিকর গাছায় প্রেরণ করা হয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেয়ার জন্য। কিন্তু তার কোন ফলশ্রুতি না দেখে ক্যাপ্টেন আযম চৌধুরী সেখান থেকে ফেরত এসে মুজাহিদ, আনসার এবং স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ছাত্রসমাজ, সর্বস্তরের জনতাকে নিয়ে স্বাধীনতাযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েন।

স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের কেন্দ্রীয় কর্মসুচী অনুযায়ী ২৩ মার্চ কুষ্টিয়া ইসলামীয়া কলেজের মাঠে স্বতঃস্ফুর্ত জনতার উপস্থিতিতে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের কুষ্টিয়া জেলা শাখার আহবায়ক,আঃ জলিল পতাকা উত্তোলন করেন। এ সময়, সেখানে উপস্থিত ছিলেন, শেখ দলিল উদ্দিন, মারফত আলী, লোকমান হোসেন, জামাল উদ্দিন খালেদ, সাইফুদ্দিন তারেক (বীরপ্রতীক) পরবর্তিতে যুদ্ধে নিহত হয় এবং সর্বস্তরের জনতা। স্বাধীনতাপ্রিয় কুষ্টিয়ার মানুষ সেনা বাহিনীর এ জাতীয় কার্যক্রম সেদিন মেনে নিতে পারেনি। সান্ধ্য আইন ভেঙ্গে তারা বেরিয়ে পড়ে রাস্তায়। তৈরি করে বেরিকেড। মজমপুর, থানাপাড়া, আমলাপাড়া, বড় বাজার গেটের কাছে জনসাধারণ রাসত্মার উপর ইট-পাটকেল, কাটা গাছের গুড়ি, এমনকি ঘরের চাল নিয়ে এসে সেনাবাহিনীর চলাচল বিঘ্ন করার উদ্দেশ্যে বেরিকেড তৈরি করে। সেনাবাহিনী সেগুলো সরিয়ে ফেলে যেন আরো মারমুখী হয়ে যায়। শুরু হয়ে যায় তুমুল যুদ্ধ।
২৫ মার্চ বেলুচ রেজিমেন্টের ১৪৭ জন সৈন্য রাত ১১ টায় পুলিশ লাইন, জেলা স্কুল, থানা ও আড়ুয়াপাড়াস্থ ওয়ারলেস অফিস ও টেলিগ্রাফ অফিসে অবস্থান গ্রহণ করে। অপরদিকে বেসামরিক মানুষ ও তৎকালীন রাজনৈতিক স্থানীয় নেতারা এরই মধ্যে বঙ্গবন্ধুর শেষ নির্দেশ পেয়ে মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্ত্ততি গ্রহন করেন। চারিদিকে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমান সিভিল সার্জন অফিসের সামনে ২৭ মার্চ একতলা ভবন থেকে রনি রেহমান নামে এক তরুণ ছাত্র পাকসেনাদের গাড়ীর উপর হাতবোমা নিক্ষেপের সময় গুলীতে প্রাণ হারায়। রনি রেহমানই মুক্তিযুদ্ধে কুষ্টিয়ার প্রথম শহীদ। এ দিনই পাকবাহিনী শহরের বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মানুষের উপর নির্বিচারে গুলীবর্ষণ শুরু করে। এতে তাৎক্ষণিকভাবেই ৭ জন মারা যায়। তাদের মধ্যে কোর্ট ষ্টেশনের জ্ঞানা সেন, কোর্টপাড়ার হাসেমের নাম জানা যায়। পাক বাহিনীর অত্যাচার আর গণহত্যায় কুষ্টিয়ার জনগণ বিদ্রোহী হয়ে উঠে। ইপিআর- এর যশোরের সেক্টরের নিয়ন্ত্রণাধীন মেজর এম এ ওসমান চৌধুরী উইং কমান্ডার এবং ক্যাপ্টেন সাদেক সহকারী অধিনায়কের দায়িত্বে ছিলেন। ৫ টি কোম্পানী ও ১ টি সাপোর্ট প্লাটুনের সমন্বয়ে ছিল ৪ নং উইং। এই উইং-এর অধীনে প্রাগপুর এলাকা‘ এ’ কোম্পানী কমান্ডার সুবেদার মোজাফ্ফর আহমেদ, ধোপাখালী, এলাকা বি কোম্পানী কমান্ডার সুবেদার খায়রুল বাশার খান, বৈদ্যনাথতলা (১৫ এপ্রিলের পর মুজিবনগর) ‘সি’ কোম্পানী কমান্ডার সুবেদার মুকিদ, যাদবপুর এলাকা‘ ডি’ কোম্পানী কমান্ডার সুবেদার মজিদ মোল্লা, উইং সদর দপ্তর‘ই’ কোম্পানী কমান্ডার সুবেদার রাজ্জাক দায়িত্বে ছিলেন। এ ছাড়া সিগন্যাল প্লাটুন হাবিলদার মুসলেম উদ্দিনের অধীনে উইং সদর দপ্তরে অবস্থান করছিল। প্রত্যেকটি কোম্পানী প্রয়োজনীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ছিল। একটি কোম্পানীতে ৫ টি হালকা ট্যাংক বিধ্বংসি কামান, ৭ টা হালকা মেশিনগান, ১ টা মেশিনগান এবং বাকী ৩০৩ রাইফেল ছিল। উইং সদর দপ্তরে ১ কোম্পানী সৈন্য ছাড়াও ৬ টি ৩ ইঞ্চি মর্টার ও ২০০ চাইনিজ স্বয়ংক্রিয় রাইফেল ছিল। এ ছাড়া একটি ব্যাটালিয়ন যুদ্ধে অংশগ্রহনের জন্য গোলাবারুদ ও যানবাহন চার নম্বর উইং-এ ছিল। অপরদিকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অধিনায়ক ছিল মেজর শোয়েব। ক্যাপ্টেন শাকিল, ক্যাপ্টেন সামাদ, এ লেঃ আতাউল্লাহ শাহ তার অধীনস্থ অফিসার হিসেবে কুষ্টিয়ায় অবস্থান করেছিল।

পাক বাহিনীর সঙ্গে ছিল ১০৬ এমএম জীপ আরোহিত রিকয়েলস রাইফেল ভারী ও হালকা চাইনিজ মেশিনগান, স্বয়ংক্রিয় রাইফেল, শক্তিশালী বেতারযন্ত্র এবং প্রচুর গোলাবারুদ। মেজর ওসমান চৌধুরী ২৫ মার্চ রাতে সস্ত্রীক কুষ্টিয়া সার্কিট্হাউসে অবস্থান করছিলেন। ২৬ মার্চ সকাল থেকে সামরিক কর্তৃপক্ষ ঢাকা থেকে বেতারে নতুন নতুন সামরিক বিধি জারী করতে থাকলে তিনি দ্রুত ঝিনেদা হয়ে চুয়াডাঙ্গা পৌঁছেই এক জরুরী সভা ডাকেন। ক্যাপ্টেন এ আর আযম চৌধুরী, ডাঃ আসাবুল হক এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও পুলিশ কর্মকর্তাগণ এক গোপন সভায় মিলিত হন। এদিকে ২৭ মার্চ সকালে পাঞ্জাবী ক্যাপ্টেন সাদেক যাদবপুর কোম্পানী সদর দপ্তরে এসে সৈনিকদের নিরস্ত্র হতে বলে এবং সে সময় জনৈক বাঙ্গালী গার্ডের সাথে ক্যাপ্টেন অসাদচরণ করলে সংঘর্ষ শুরু হয়। এতে ক্যাপ্টেন সাদেকসহ তার পাঞ্জাবী সহযোগিরা নিহত হয়। এই আকষ্মিক সংঘর্ষের পর মেজর ওসমান প্রশাসনিক বিষয়, সামরিক ও বেসামরিক সিন্ধামত্ম এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যোগাযোগ স্থাপন ও রাজনৈতিক সমর্থনের জন্য একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করেন। সংসদ সদস্য ডাঃ আসাবুল হক, এ্যাডঃ ইউনুস আলী ও ব্যারিষ্টার বাদল রশীদ এই উপদেষ্টা পরিষদের অন্যতম সদস্য ছিলেন। উপদেষ্টা পরিষদের সাথে আলাপ করেই কুষ্টিয়া জেলা শ্রত্রুমুক্ত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। মেজর ওসমান সীমান্তে অবস্থানরত সব ইপিআর সৈনিকদের চুয়াডাঙ্গা সদর দপ্তরে সমবেত এবং প্রাগপুরের কোম্পানী কমান্ডার সমবেত এবং প্রাগপুরের কোম্পানী কমান্ডার সুবেদার মোজা্ফ্ফরকে কুষ্টিয়ার পথে অভিযান শুরু করার নির্দেশ দেন।

কুষ্টিয়া শহরের পুলিশ লাইন, জিলা স্কুল ও আড়ুয়াপাড়া ওয়ারলেসে পাকবাহিনী অবস্থান নিয়েছিল। তিনদিক থেকে একই সময় যুগোপৎ আক্রমন করার পরিকল্পনা অনুযায়ী ক্যাপ্টেন আযম চৌধুরীকে জেলা স্কুলে অবস্থিত সৈন্য ঘাঁটির উপর আক্রমন চালানোর আদেশ দেয়া হয়। এই তিনটি স্থানের মধ্যে জিলা স্কুল ছিল সবচেয়ে বড় এবং শক্তিশালী। পাক ঘাঁটি সুবেদার মোজাফ্ফরকে পুলিশ লাইন ও নায়েক সুবেদার মনিরুজ্জামানকে (পরবর্তীতে শহীদ) ওয়ারলেস ষ্টেশন আক্রমন করতে আদেশ দেয়া হয়। যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য কোন রকম ফিল্ড ওয়ারলেস বা ফিল্ড টেলিফোনও ছিল না তখন। অগত্যা টেলিফোন বিভাগের সাহায্য পোড়াদহের আইলচারা গ্রামের একটি মাঠে ফিল্ড এক্সচেঞ্জ লাগানো হয়। ডাঃ আসহাবুল হকের নেতৃত্বে ফিল্ড চিকিৎসা কেন্দ্র, ডাক্তার ও ওষধের ব্যবস্থা করা হয়। ২৮ মার্চ দুপুর ১২ টার মধ্যে সীমান্তের সমস্ত কোম্পানী আদেশক্রমে চুয়াডাঙ্গায় সমবেত হয়। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী এক কোম্পানী সৈন্য ঝিনেদা পাঠানো হয়। এবং সেখানে তারা যশোর-ঝিনেদা সড়ক অবরোধ করে যেন যশোর সেনানিবাস থেকে কোন সৈন্য বা অস্ত্র কুষ্টিয়াকে সরবরাহ করতে না পারে।

অন্য আর এক কোম্পানী সৈন্য ক্যাপ্টেন আযম চৌধুরীর নেতৃত্বে চুয়াডাঙ্গা পোড়াদহ কাঁচা রাস্তা দিয়ে পোড়াদহে পাঠানো হয়। ক্যাপ্টেন আযমের প্রতি নির্দেশ ছিল তার গন্তব্যস্থানে পৌছাবার পরেই যেন সে সুবেদার মোজাফফরের সাথে যোগাযোগ করে চুয়াডাঙ্গা হেড কোয়াটারে রিপোর্ট পাঠায়। পরিকল্পনা ছিল ক্যাপ্টেন আযমের কোম্পানী শহরের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে অর্থাৎ সার্কিট হাউসে আক্রমন করবে এবং সুবেদার মোজাফফরের কোম্পানী পুলিশ লাইন ও এক প্লাটুন সৈন্য এবং স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর কিছু লোক পূর্বদিক থেকে নায়েব সুবেদার মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বে মোহিনী মিল সংলগ্ন ওয়ারলেস ষ্টেশনের উপর আক্রমন চালাবে। এবং ঐক্যবদ্ধ আক্রমন হবে একই সময়ে তিনদিক থেকে। আক্রমনের তারিখ নির্ধারণ হয় ২৯ মার্চ ভোর ৪টা। সমসত্ম আয়োজন সম্পন্ন। কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থার অসুবিধার কারণে এবং ১ টা গাড়ী দুর্ঘটনার কারণে সুবেদার মোজাফফরের সৈন্য নির্দিষ্ট স্থানে পৌছাতে পারেনি। ফলে পরের দিন অর্থাৎ ৩০ মার্চ ভোর ৪ টার সময় নির্ধারিত হয়। ৩০ মার্চ ভোর ৪ টায় তিনদিক থেকে অতর্কিতভাবে কুষ্টিয়ায় আক্রমন শুরু হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী আক্রমনের সাথে সাথে স্থানীয় হাজার হাজার জনগণ গগণবিদারী‘ জয় বাংলা’ জয়ধ্বনিতে কুষ্টিয়ার আকাশ বাতাস মুখোরিত করে তোলে। এতে শত্রু পক্ষের মনোবল মারাত্মক ভাবে ভেঙ্গে পড়ে। মাত্র এক ঘন্টা তুমূল যুদ্ধের পর মুক্তিযোদ্ধা ও সৈন্যরা পুলিশ লাইন ও ওয়ারলেস কেন্দ্রের ভেতর ঢুকে শত্রু খতম করতে থাকে। উপায়ান্তর না দেখে সামান্য সংখ্যক পাকিসত্মানি সৈন্য ভীত হয়ে তাদের অস্ত্রশস্ত্র ফেলে দিয়ে সদর দপ্তর জিলা স্কুলের দিকে পালিয়ে যেতে থাকে। পালাবার সময় অনেক পাক সৈন্য নিহত হয়।

পুরোদিনের যুদ্ধে একমাত্র জিলা স্কুল ছাড়া সমস্ত শহর মুক্তিবাহিনীর দখলে চলে যায়। বিজয় উল্লাসে মুক্তিযোদ্ধারা প্রবল শক্তিতে জিলা স্কুলের চারদিকে অবস্থান নিয়ে যুদ্ধ অব্যাহত রাখে। এ সময় হাজার হাজার মুক্তিকামী মানুষ মুক্তিযোদ্ধাদের খাদ্য সরবরাহ করতে থাকে। এদিকে ওয়ারলেস সেটে শত্রুপক্ষের আবেদন ধরা পড়ে। যশোর সেনানিবাস থেকে প্রতি উত্তরে জানিয়েছিল, তোমাদের সাহায্য করা সম্ভব নয়। নিজ চেষ্টায় আত্মরক্ষা কর।’ পরদিন ৩১ মার্চ তুমূল যুদ্ধ চলে। সারাদিন যুদ্ধের পর জীবিত শত্রুর সংখ্যা ছিল ৪০/৫০ জন। তার মধ্যে অধিকাংশই অফিসার। গত্যমত্মর না দেখে রাতের অন্ধকারে তারা ২ টি জীপ ও ১ টি ডজ গাড়ীতে চড়ে ঝিনেদার দিক পালিয়ে যেতে চেষ্টা করে। মুক্তিযোদ্ধারা ঠিক পেয়ে ওদের পথ অনুসরণ করে। গাড়াগঞ্জের ব্রীজের কাছে মুক্তিযোদ্ধারা গর্ত খুড়ে সেটা ঢেকে রেখেছিল। পাকসেনারা তা জানতোনা। তাদের গাড়ী দুটো গর্তে পড়ে গিয়ে মেজর শোয়েবসহ শত্রুসেনারা মারা যায়। বাকীরা আহত অবস্থায় পাশ্ববর্তী গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। কিমত্ম সজাগ মুক্তিযোদ্ধা, স্বেচ্ছাসেবক ও জনগণ তাদের লাঠি দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে। ১ লা এপ্রিল কুষ্টিয়া সম্পূর্ণরুপে শত্রুমুক্ত হয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে চলে যায়। এই যুদ্ধে ৪ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন এবং অনেকে আহত হন। পুর্ব নির্দেশ অনুযায়ী ক্যাপ্টেন আযম চৌধুরী কুষ্টিয়ায় অধিকৃত সমসত্ম অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ ও গাড়ী ৩ এপ্রিল ভোরে চুয়াডাঙ্গায় পাঠিয়ে দেন।

ঐদিন চুয়াডাঙ্গায় ফরাসী টেলিভিশন কর্পোরেশনের ভ্রাম্যমান দল এসে হাজির, তারা মেজর ওসমান চৌধুরীর সাক্ষাৎকারে গ্রহনের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। সে সময় পর্যমত্ম একমাত্র বিবিসি ও আকাশবাণী ছাড়া আর কোথাও আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সঠিক তথ্য প্রকাশ পায়নি। দীর্ঘ ১৫ মিনিট ধরে ওসমান চৌধুরীর সাক্ষাৎকার নেয়া হয়। ঠিক এমনি সময় চুয়াডাঙ্গার উপর পাকিসত্মান বিমান বাহিনীর বিমান হামলা শুরু হয়। বিমানে আর মাটিতে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ চলতে থাকে বেশ কিছুক্ষণ ধরে। এই সুযোগে ফরাসী টিভি সদস্যরা সে চিত্র বন্দী করে রাখেন। বাংলার মাটিতে নিক্ষিপ্ত হলো প্রথম নাপাম বোমা। এদিন কুষ্টিয়া শহরসহ বিভিন্ন এলাকায় এ বোমায় ক্ষত-বিক্ষত হলো বাংলার পবিত্র মাটি। কুষ্টিয়া শহরের যত্রতত্র বোমা এবং হেলিকপ্টারের মেশিন গানের আক্রমন চললো। মুক্তিযোদ্ধারা সামান্য হাতিয়ার নিয়ে গুলি চালালো পাকিস্তানী বিমান দস্যুদের উপর। পাকসেনারা শোচনীয় পরাজয়ের পর কুষ্টিয়া পূর্ণদখলের জন্য সচেষ্ট হয়। আকাশ ও জলপথে যশোর সেনানিবাসে ব্যাপক সৈন্য ও অস্ত্র নিয়ে আসা হয়। এ সময় পাকবাহিনীর একটি দল আরিচা থেকে জলপথে ১১ এপ্রিল কুষ্টিয়ায় আসে। সামান্য সংখ্যক অস্ত্র সাথে নিয়ে নায়েব সুবেদার শামসুল হকের নেতৃত্বে একদল মক্তিযোদ্ধা গোয়ালন্দে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তাদের উপর নির্দেশ ছিল, পাকসেনারা যেন কোনমতেই পদ্মার এপাড়ে অবতরণ করতে না পারে।

১৩ এপ্রিল অগ্রগামী সৈন্যের সাথে পদ্মার পাড়ে মুক্তিযোদ্ধাদের তীব্র সংঘর্ষ হয়। এতে পাকবাহিনীর একটি জাহাজ ডুবে যায় এবং তারা উত্তর দিকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। নগরবাড়ীতে অবতরণ করে পাকসেনারা তীব্র গতিতে পাবনার দিকে অগ্রসর হয়। ভেড়ামারায় অবস্থিত মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে প্রচন্ড গুলী বিনিময়ের পর পাকসেনারা ভেড়ামারা এলাকায় অবতরণ করে। ঐ কমান্ডের দায়িত্বে ছিলেন সুবেদার মেজর মোজাফ্ফর। তিনি বাধ্য হয়ে তার সেনাদল নিয়ে পিছু হটে যায়। এ সময় ঝিনাইদহে তাদের পতন হয়। দীর্ঘ ১৭ দিন মুক্ত থাকার পর কুষ্টিয়া পুনরায় শত্রুদের হাতে চলে যায়। এর পর পাকসেনারা শহরে প্রবেশ করেই অগ্নিসংযোগ, গণহত্যা এবং ত্রাসের রাজত্ব চালিয়ে যায়। সে সময় শহরেও লোকসংখ্যা খুবই কম ছিল। যারা ছিল তারা পাক সেনার হাতে নিহত হন। পাকসেনারা বাঙ্গালীদের বাড়ি বেছে বেছে অগ্নিসংযোগ করে। এর পর ঢাকায় মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে সারাদেশকে শত্রু মুক্ত করতে এম এন এ,এমসিএ‘র ভোটের মাধ্যমে গঠিত জোনাল কাউন্সিল চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হয়।

বেছে বেছে যুবকদের বাছাই করে ভারতের বিভিন্ন জায়গায় গেরিলা ট্রেনিং দিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন সেকটরে তাদের প্রেরণ করা হয়। কুষ্টিয়ার বিভিন্ন রনাঙ্গনে প্রতিরোধ বাহিনীর পরাজয়ের পর এ জেলার স্বাধীনতার স্বপক্ষে রাজনৈতিক নেতা, ছাত্রনেতা, সেনাবাহিনীর সদস্য, ইপিআর, পুলিশ, আনসার, মুজাহিদ, ছাত্র, যুবক, মুক্তিকামী হাজার হাজার মানুষ দেশ ত্যাগ করে পালিয়ে যায়। ১৭ এপ্রিল বিকেলে তৎকালীন কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার(পরবর্তিতে মুজিবনগর) আম্রকাননে ১০ এপ্রিল তারিখে গঠিত বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের শপথ গ্রহন ও পরিচিতি অনুষ্ঠান অনুষ্টিত হয়।

মুক্তিযুদ্ধের রণাংগনকে ১১ টি সেকটরে ভাগ করা হয়। বৃহত্তর কুষ্টিয়া জেলা ৮ নং সেকটরের অধীন ছিল। মেজর আবু ওসমান চৌধুরী ৮ নং সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১০ ডিসেম্বর সকালে কুষ্টিয়া শহরের দক্ষিণে চৌড়হাস বি টি সি তামাক ক্রয় কেন্দ্রের কাছে জিকে ক্যানেলের ব্রীজের উত্তর পাশে মেইন রাস্তার পাক সৈন্যের বিরুদ্ধে মুক্তিবাহিনী-মিত্র বাহিনী যৌথভাবে পাকিস্তানবাহিনীর সাথে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়। এখানেও মিত্র বাহিনীর ৭০ জন শহীদ হন। ১০ ডিসেম্বর সন্ধ্যা পর্যন্ত কুষ্টিয়া জেলার সমস্ত এলাকা স্বাধীন ও শত্রু মুক্ত হয়। ১১ ডিসেম্বর কুষ্টিয়া শহর, পোড়াদহ, মিরপুর, ভেড়ামারা এলাকা স্বাধীন শত্রুমুক্ত হয়। সেদিনের ধবংসলীলা কুষ্টিয়া শহরে আজও স্মৃতি বহন করে। এপ্রিল মাস থেকে ডিসেম্বর পর্যমত্ম সর্বমোট ২২ টি ছোটবড় যুদ্ধ শেষে কুষ্টিয়া ১১ ডিসেম্বর শত্রু মুক্ত হয়েছিল। শত্রুমুক্ত কুষ্টিয়াতে তৎকালীন প্রাদেশিক পরিষদের জোনাল চেয়ারম্যান আব্দুর রউফ চৌধুরী কুষ্টিয়া কালেক্টরেট চত্বরে অফিসিয়ালী জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে জোনাল কাউন্সিলের সেক্রেটারী এম শামসুল হক কে জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্বভার দেন। মুক্তিযুদ্ধে কুষ্টিয়ার কবি, ছাত্র, সাহিত্যিক, শিল্পি, লেখকের ভুমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।

এ ছাড়া হাউজিং এর খেলোয়াড় সরোওয়ার্দী, শিক্ষকদের মধ্যে ইসলামিয়া কলেজের অধ্যাপক দূর্গাদাস সাহা প্রমুখ শহীদ হন। সেদিনের কুষ্টিয়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বের ইতিহাস আজও মানুষের মনে দাগ কাটে। আজ স্বাধীনতার ৪৩ বছরেও সঠিক ভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়িত হয়নি। যুদ্ধাপরাধীরা এখনও বহাল তবিয়তে আছে। আজ সময় এসেছে এ দেশে যু্দ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন করার। তা না হলে লাখো শহীদের রক্তের সাথে বেঈমানীর সামিল হবে। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ গড়তে আমাদের সকলের এই হোক অঙ্গিকার।

Post has attachment
পদ্মার কোলে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে ছেয়ে থাকা দক্ষিণ জনপদের দ্বারপ্রান্ত ভেড়ামারা ও পাকশী বেড়ানোর এক অপরূপ নিসর্গে পরিণত হয়েছে। এখানে এলে রূপসী পদ্মার ঢেউয়ের কলধ্বনি, চারদিকে সবুজের বেষ্টনী ও উত্তাল হাওয়ার পরশে যেমন হৃদয় ভরিয়ে দেয়। তেমনি এ এলাকায় রয়েছে ইতিহাস ও প্রাচীন কীর্তিসহ বিংশ শতাব্দীর প্রথম ও দেশের বৃহত্তম রেল সেতু হার্ডিঞ্জ ব্রিজ এবং দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম লালন শাহ সেতু। সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার স্মৃতিচিহ্নে সমৃদ্ধ ভেড়ামারা পর্যটনের মনোরম স্পটে সমৃদ্ধ হয়েছে। দেশের দর্শনীয় স্থানগুলোর তালিকায় যুক্ত হয়েছে আরো একটি অন্যতম স্থান। প্রতিদিন শত-সহস্র দর্শনার্থীর ভিড়ে মুখর হয়ে থাকে ভেড়ামারা-পাকশীর উভয় পাড়। সকাল-বিকাল মনে হয় যেন এক মিলনমেলা। স্বচোখে না দেখলে বুঝা যাবে না।

ভেড়ামারার অন্যতম কীর্তি হলো হার্ডিঞ্জ ব্রিজের দক্ষিণ পাশে লালন শাহ সেতু। যমুনা সেতুর অনুরূপ লালন শাহ সেতু বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সড়ক সেতু। প্রমত্তা পদ্মা নদীর ওপর ১ হাজার ৭৮৬ মিটার দৈর্ঘ্যের এবং ৭.৫ মিটার দুই লেন বিশিষ্ট এ সেতুটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সরাসরি সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে এক নেটওয়ার্ক সৃষ্টি করেছে এবং সেতুর উভয় পাড়ে দু'টি টোল প্লাজা যেন আরো শ্রীবৃদ্ধি করেছে। এই সেতুর পূর্ব প্রান্তে ১০ কিলোমিটার ও পশ্চিম প্রান্তে ৬ কিলোমিটার রাস্তাটি সৌন্দর্য কেড়েছে। লালন শাহ্ সেতু দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং পরিবহন ব্যবস্থার প্রসারে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছে।

হার্ডিঞ্জ ব্রিজ প্রবীণদের কাছে ‘সাড়া পুল'। আজ যাদের বয়স ৮০/৯০ বছর তাদের কাছে সাড়া পুল ছিল এক স্বপ্ন। যমুনায় সেতু যেমন এক স্বপ্নের বাস্তবায়ন তেমনি ভেড়ামারায় লালন শাহ সেতু স্বপ্নের বাস্তবায়ন। প্রবীণরা জানান, ১৮৯০ সালে শিলিগুড়ি মিটারগেজ রেলপথ স্থাপিত হলে প্রমত্তা পদ্মার এক তীরে সাড়া ঘাট ও অন্য তীরে দামুকদিয়া ঘাটের মধ্যে চলাচল শুরু হয় রেল, ফেরি ও স্টীমার। ১৯১০ সালে পদ্মার ওপর সেতু নির্মাণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলে পদ্মার গতিকে নিয়ন্ত্রণ করা ছিল অত্যন্ত দুরূহ কাজ। এই দুরূহ কাজ করতে গিয়ে বিশ্বে প্রথম রিভার ট্রেনিং ও গাইড বাঁধ নির্মাণ করা হয় পদ্মার উভয় পাড়ে। প্রায় ৮ কিলোমিটার উজান থেকে গাইড ব্যাংক বেঁধে এনে ১৯১২ সালে শুরু হয় রেল সেতুর কাজ। এভাবে পদ্মার গতিকে নিয়ন্ত্রণ করে রেল সেতুর কাজ শুরু হয়।

এরপর নরম পলিমাটিতে স্প্যান নির্মাণ ছিল আরেকটি দুরূহ কাজ। রিভার বেড বা নদী শয্যার নিচে ১৯০ থেকে ১৬০ ফুট গভীরতায় কূপ খনন করে স্থাপিত হয় স্প্যান। এভাবে প্রতিটি ৫২ ফুট উচ্চতার ১৫টি স্প্যান ও দু'পাশে শক্ত কাঠামোর ল্যান্ড স্প্যানের ওপর ৫ হাজার ৮৯৪ ফুট দীর্ঘ রেল সেতু নির্মাণ করা হয়, যা আজ এক অমর কীর্তি হিসেবে স্থান পেয়েছে। তৎকালীন প্রকৌশলী জগতের বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব রবার্ট উইলিয়াম গেলস ও ফ্রান্সিস প্রিংগের নকশায় ব্রেইন্স ওয়ালটি এন্ড ক্রিম নামের প্রতিষ্ঠান এই রেল সেতু নির্মাণ করে। ১৯১৫ সালের ১ জানুয়ারি পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি মালবাহী বগি নিয়ে একটি ইঞ্জিন সেতু অতিক্রম করে। জানা গেছে, সোনা মিয়া নামে এক চালক প্রথম ইঞ্জিন নিয়ে পাড়ি দেন সেতু। এরপর ১৯১৫ সালের ৪ মার্চ তৎকালীন ভাইস লর্ড হার্ডিঞ্জ আনুষ্ঠানিকভাবে সে সময়ের বৃহত্তম রেল সেতুটির উদ্বোধন করেন। সেই থেকে প্রথম ডবল লাইনের এই রেল ব্রিজের নাম হয় হার্ডিঞ্জ ব্রিজ। মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা অর্জনের স্মৃতিচিহ্ন বহন করছে এই সেতু।

Post has attachment
শিয়ালদহ থেকে কুষ্টিয়া পর্যন্ত দেশে প্রথম রেল লাইন চালু হয় ১৮৬২ সালে। বাংলাদেশের সর্বপ্রথম রেলওয়ে স্টেশন জগতি রেলওয়ে স্টেশন। পুরাতন স্টেশন হিসাবে উন্নয়নের ছোয়া লাগেনি এ স্টেশনের। সংস্কার না থাকায় এ স্টেশনের পুরাতন বিল্ডিং গুলো ধ্বসে ধ্বসে পড়েছে। সরকারি জায়গা গুলোও বেহাত হয়ে গেছে।

সূত্রমতে, জগতি রেল স্টেশনটি ১৮৬২ সালে স্থাপিত হয়। ওই সময় প্রথম স্টেশন হওয়ার জন্য এখানেই সকল লোকজনের উঠা নামার কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত ছিল। লোক সমাগমের কারণেই জগতি বাণিজ্যিকভাবে আমদানি-রফতানির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। স্টেশনটি ইঞ্জিলের জ্বালানির উপর নির্ভরশীল ছিল। স্টেশনের দুইপাশে দুটি বড় ইন্দারা আজও আছে। লোকজনের ভিড় সামাল দিতে এক সময়ে এখানে ২৬জন রেলওয়ে কর্মকর্তা কর্মচারী নিয়োগ ছিল। এখন সেখানে মাত্র ৩জন রয়েছে। লোকবলের অভাবে এখন স্টেশনের কার্যক্রমও ভেঙে পড়েছে। যাত্রীরা বিভিন্নভাবে হয়রানী শিকার হচ্ছে। দীর্ঘদিন সংস্কার না করায় স্টেশনের সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে গেছে। ট্রেনের যাত্রীরা সুযোগ সুবিধা না পাওয়ায় এ ষ্টেশনে আর কেউ যায়না বললেই চলে। স্টেশনটির সংস্কার জরুরি। যাতায়াতের জন্য রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও অযত্নে অবহেলায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী কুষ্টিয়া-ভেড়ামারা রায়টা ঘাট রেল লাইন। সংস্কারের অভাবে স্টেশনগুলো জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে।

Post has attachment
বাংলাদেশে উপজেলা সদরের মধ্যে অন্যতম এবং গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি ভেড়ামারার। কুষ্টিয়া জেলা সদর হতে ২৩ কিলোমিটার উত্তর পশ্চিমে অবস্থিত ভেড়ামারা উপজেলা সদর। ১৫৩.৭২ বর্গকিলোমিটার ভূখন্ডের ভেড়ামারা উপজেলায় বসবাস করে ১লক্ষ ৭৫ হাজার ৪৮০ জন মানুষ। এর মধ্যে পুরুষ রয়েছে ৯০ হাজার ৭০০ এবং মহিলা রয়েছে ৮৪ হাজার ৭৮০ জন।

এ উপজেলার উত্তর পূর্বে পদ্মানদীর উপর দুই সমান্তরাল যুগল সৌন্দর্য ‘হার্ডিঞ্জব্রীজ’ ও ‘লালনশাহ’ সেতু। পূর্ব দক্ষিণে জেলার মিরপুর ও পশ্চিমে দৌলতপুর উপজেলা এবং পূর্বে কুষ্টিয়া সদর উপজেলা। ১টি পৌরসভা ও ৬টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত ভেড়ামারা উপজেলা পরিষদ। এখানে রয়েছে ৮১টি গ্রাম এবং ৪৩টি মৌজা। ভেড়ামারা পূর্বে থানা হিসেবে পরিচিতি থাকলেও ১৯৮১ সালের ৭ নভেম্বর ভেড়ামারা উপজেলা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। কুষ্টিয়ার পরেই দেশের এবং বিশ্বের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ভেড়ামারার সুনাম। দেশের বৃহত্তম গঙ্গা কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প, ৬০ মেগওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, বিশ্বের ১১তম বৃহৎ এবং দেশের বৃহৎ রেলওয়ে সেতু ‘হার্ডিঞ্জ ব্রীজ’ এবং নৈসর্গিক সমান্তরাল সেতু দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সড়ক সেতু ‘লালনশাহ’।

রয়েছে হযরত সোলাইমান শাহ্ চিশতির মাজার শরীফ এবং গায়েবী মসজিদ খ্যাত তিন গম্বুজ মসজিদ। ভেড়ামারা উপজেলার নামকরণের কোন সুনির্দিষ্ট ইতিহাস জানা যায় না। তবে লোক মুখে এবং শহুরীগ্রামাঞ্চলে নানা কথার প্রচলন রয়েছে। জানা যায়, ভেড়ামারা এলাকায় অতীতে প্রচুর ভেড়া পালন করা হতো। তৎকালীন ব্রিটিশ আমলে ট্রেন চলাকালীন অবস্থায় ভেড়ামারা ষ্টেশন সংলগ্ন এলাকায় একযোগে শতাধিক ভেড়া ট্রেনের নীচে পড়ে কাটা পড়ে মারা যায়। সেই সময় ‘ভেড়া’ হতেই ভেড়ামারার নামকরণ করা হয়েছিল ভেড়ার ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য।

Post has attachment
১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সময় বর্তমান কুষ্ঠিয়া জেলা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল হিসেবে পুর্ব বাংলার অন্তর্ভুক্ত হয়। তার আগে বর্তমান কুষ্টিয়া জেলা ছিলো অবিভক্ত। বাংলাদেশের প্রেসিডেন্সী বিভাগের অন্যতম নদীয়া জেলার অংশ।

বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ১৭৬৫ সালে বাংলা বিহার উড়িষ্যার দেওয়ানী লাভ করলে নদীয়া তাদের শাসনাধীনে চলে আসে। নদীয়া প্রাচীন কাল থেকে জ্ঞান-বিজ্ঞানে বিশেষ খ্যাত ছিলো। বারোশ শতকের শেষাংশ থেকে বাংলার শেষ স্বাধীন হিন্দু নরপতি লক্ষন সেনের রাজধানী ছিলো নদীয়া। ১২০১ সালে [মতান্তরে ১২০৩] ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজী নামক একজন মুসলিম সেনাপতি মাত্র আঠারো জন অশ্বারহী সৈন্য নিয়ে লক্ষন সেনের রাজধানী নদীয়া দখল করে বাংলায় সর্বপ্রথম মুসলিম শাসনের সূত্রপাত করেন।

মোঘল সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে মেহেরপুরের বাগোয়ানের ভবানন্দ মজুমদার [বাল্যনাম দির্গাদাশ সমাদার] যে রাজবংশ নিয়ে জমিদারি কায়েম করেন তা নদীয়া নামে পরিচিত হয়। নদীয়া রাজ্যের জমিদারি এলাকা ছিলো ৩.১৫১ বর্গমাইল। নদীয়া রাজ্যের জমিদারি এলাকা ছিলো বর্তমান পশ্চিম বাংলার নদীয়া জেলার সদর মহকুমা ও রানাঘাট মহকুমার দক্ষিন অঞ্চল, মেহেরপুর জেলার কিছু অংশ, যশোরের বনগাঁ ও যশোর সদরের দক্ষিন পুর্বাংশ, পশ্চিম সাতক্ষীরা অঞ্চল।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় [১৭৯৬ সাল] সাতসৈকা পরগনা ও স্বরস্বতীয় পুর্বতীরাঞ্চল নদীয়া রাজ্যভুক্ত হয়। ১৭৯৬ সালে নদীয়া ও যশোরের সীমানা নিদিষ্ট হলেও পরে তা বহুবার উভয় জেলার সীমানা পরিবর্তন হয়েছে। যশোরের সঙ্গে নদীয়া ও কুষ্টিয়া জেলার সম্পর্ক বহুকালের। ১৭৯৯ সালে মির্জানগর যশোরের সাথে সংযুক্ত হয়। ১৮০২ সালে আনুওয়ারপুর জমিদারী ২৪ পরগোনা জেলার এবং ১৮১২ সালে টাকী ও সুখসাগর থানা যশোর থেকে নদীয়ার সাথে যুক্ত হয়। ১৮২৩ সাল পর্যন্ত চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর এলাকা যশোর জেলার অংশ হিসেবে শাসিত হয়েছে। ১৮৬৩ সালে পাবনা থেকে কুষ্টিয়া মহকুমা এবং ১৮৭১ সালে সালে কুমারখালী মহকুমা নদীয়ার সাথে যুক্ত হয়। ১৮২৭ সালে খোকসা থানা যশোর থেকে পাবনার সঙ্গে এবং ১৮৭১ সালে কুমারখালী মহকুমা নদীয়া জেলার সাথে অনর্ভুক্ত হয়।

Post has attachment
সাহিত্য ও সংস্কৃতির রাজধানী হিসেবে পরিচিত কুষ্টিয়া জেলার উত্তর পশ্চিম এবং উত্তরে পদ্মা নদীর অপর তীরে রাজশাহী, নাটোর ও পাবনা জেলা, দক্ষিণে ঝিনাইদহ জেলা, পশ্চিমে মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গা জেলা এবং ভারতের নদীয়া ও মুর্শিদাবাদ জেলা এবং পূর্বে রাজবাড়ী জেলা অবস্থিত। ভারতের সাথে কুষ্টিয়ার ৪৬.৬৯ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকা আছে।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি বিজড়িত এই কুষ্টিয়া শিল্প সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে বাংলাদেশকে করেছে সমৃদ্ধ। এছাড়াও বিষাদ সিন্ধুর রচয়িতা মীর মশাররফ হোসেন এবং বাউল সম্রাট লালনের তীর্থভূমি, পুরাতন কুষ্টিয়া হাটশ হরিপুর গ্রামে গীতিকার, সুরকার ও কবি আজিজুর রহমানের বাস্ত্তভিটা ও কবর, এ জনপদে জন্মগ্রহণকারী বিশিষ্ট কবি দাদ আলী, লেখিকা মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা, ‘‘এই পদ্মা এই মেঘনা’’ গানের রচয়িতা আবু জাফর, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমান, কুষ্টিয়ার সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠাতা কাঙাল হরিণাথ, নীল বিদ্রোহের নেত্রী প্যারী সুন্দরী, স্বদেশী আন্দোলনের নেতা বাঘা যতিন, প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম সিদ্দিকী, সঙ্গীত শিল্পী মোঃ আব্দুল জববার, ফরিদা পারভীনসহ অসংখ্য গুণীজনের পীঠস্থান কুষ্টিয়াকে সমৃদ্ধ করেছে।

Post has attachment
নীল হাঙ্গামা জনিত কারনে বিচারের জন্য ভালুকায় [কুমারখালী] একটি মুনসেফী আদালত প্রতিষ্ঠা হয়। ঈষান চন্দ্র দত্ত প্রথম মুনসেফ ১৮৬৩ সালে কুষ্টিয়া থানা ও কুমারখালী থানা পাবনা জেলার অর্ন্তভুক্ত হলে ভালুকা মুনসেফী আদালত উঠে যায়।

পরবর্তীতে ১৮৬৩ সালে কুষ্টিয়া মহকুমার মর্যাদা পায় তারপর কুষ্টিয়ায় মুনসেফী আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়। কুষ্টিয়া প্রথমে রাজশাহী জেলা জাজশীপের অধীনে ও পরে পাবনা জেলা জাজশীপের অধীনে থাকে। কুষ্টিয়াতে পৃথক জেলা জজ নিয়োগের আগ পর্যন্ত পাবনা জেলা জজ সাহেব মাসে ১৫ দিন কুষ্টিয়া বসে বিচার কাজ করতেন।

বর্তমানে জেলা জজ সাহেবের বাসভবনে বর্তমান জজ কোর্ট নির্মানের পুর্ব পর্যন্ত জেলা জজের এজলাস বসত এবং ইসলামিয়া কলেজ বিল্ডিং এ মুনসেফ কোর্ট বসত। ১৭/১১/১৯৬৮ ইং তারিখে কুষ্টিয়া জেলার জন্য পৃথক জেলা জজ কোর্ট নির্মান করা হয়।

Post has attachment
খোকসা থানার নামকরনের যথার্থ কোন ইতিহাস পাওয়া যায়নি। কিংবদন্তী থেকে জানা যায়, বর্তমান খোকসার কালী নাকি জনৈক তান্ত্রিক সাধুর দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। সেই নৈষ্ঠ্যিক আত্তপ্রচার বিমুখ তান্ত্রিক সাধুটি গড়াই নদীর তীরে খোকসা গাছ দ্বারা বেষ্টিত একটি নির্জন স্থানে প্রথম কালী পূজা আরম্ভ করে। এই নির্জন জঙ্গলাকীর্ণ স্থানে সে সময় কেই যেত না জনৈক জমিদার পুত্রের সর্প দংশনের পর অজ্ঞানাবস্থায় এই কালী সাধকের নিকট আনা হয় এবং উক্ত সাধক সংজ্ঞাহীন যুবকটিকে কালীর পদতলে শুইয়ে দিয়ে দুয়ার বন্ধ করে দেয়। অতঃপর সাধকের সাধনায় কালীর কৃপায় যুবকটি বেঁচে উঠে। যাবতীয় খবর পেয়ে জমিদার আসেন এবং পুত্রকে ফিরে পেয়ে কালীর প্রতি ভক্তি-আপ্লুত হয়ে উঠেন। তারপর তান্ত্রিক সাধুর নির্দেশমত জমিদার মাঘী আমাবশ্যায় এক রাতে সাড়ম্বরে কালীর পূজা দেন। সেই থেকে খোকসা গাছ বেষ্টিত এই কালীর নামহয় ‘খোকসার কালী’ এবং উক্ত স্থানও খোকসা নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।

http://kushtiatown.com/kushtia-town/khoksa-town/292-identity-khoksa
Wait while more posts are being loaded